ডায়াবিটিসে ইনসুলিন নিতে হয়? তা হলে অবশ্যই মাথায় রাখুন এ সব
ডায়াবিটিসে আক্রান্ত হলে নিয়ম মানার সতর্কতা তো রয়েইছে, তার সঙ্গে রয়েছে ইনসুলিনের খামখেয়ালিপনা নিয়েও চিন্তা। টাইপ ১ ডায়াবিটিসে ভুগলে ভয়–ভীতি করে কোনও লাভ নেই, কারণ তাঁদের শরীরে ইনসুলিন তৈরি হয় না বলে গোড়া থেকেই ইনজেকশন নিতে হয়৷ তবে এ তো মাত্র ৫–১০ শতাংশ রোগীর গল্প৷ ডায়াবেটিক রোগীদের মধ্যে ৯০–৯৫ শতাংশেরও বেশি ভোগেন টাইপ ২ বা অ্যাডাল্ট অনসেট ডায়াবিটিসে৷
![]() |
| প্যানক্রিয়াস থেকে পর্যাপ্ত ইনসুলিন না বেরলে বাইরে থেকে ইনসুলিন দিয়ে রক্তে সুগারের মাত্রা কমাতে হয়৷ |
ডায়েট, ব্যায়াম ও ওষুধের নিয়ম মানার পরও যখন আর প্যানক্রিয়াস থেকে পর্যাপ্ত ইনসুলিন বেরয় না, তখন বাইরে থেকে ইনসুলিন দিয়ে রক্তে সুগারের মাত্রা কমাতে হয়৷
ভুল করছিলেন ? শুধরে নিন
ইনসুলিনে শরীরের কোনও ক্ষতি হয় না৷ প্রয়োজন সত্ত্বেও না নিলে বরং আয়ু কমে, প্রেশার–কোলেস্টেরল বাড়তে পারে, হার্ট, কিডনি থেকে শরীরের সব প্রত্যঙ্গই খারাপ হতে শুরু করে৷ অতএব, ডাক্তার বললে, নির্দ্বিধায় শুরু করুন৷ ইনসুলিন নিলেও খাবারে নিয়ন্ত্রণ রাখা দরকার৷ কারণ ইনসুলিনে সুগার কমে, ওজন তো আর কমে না ডায়াবেটিস থাকলে এমনিতেই হাই প্রেশার–কোলেস্টেরল ও হূদরোগের চান্স থাকে৷ ওজন বাড়লে সে চান্স আরও বেড়ে যায়৷ বেশি প্রোটিন খেলে কিডনি খারাপ হয় দ্রুত৷ অতএব ইনসুলিন নিন বা ওষুধ খান, খেতে হবে লো–ক্যালোরির সুষম ও ফাইবারযুক্ত খাবার৷ ইনসুলিন নিলে দু’–এক কেজি ওজন বাড়ে৷ শুয়েবসে থাকলে তা আরও বেড়ে যায়৷ তার হাত ধরে বাড়ে রোগের জটিলতা৷ কাজেই নিয়মিত ব্যায়াম করে শরীর একেবারে ছিপছিপে রাখা দরকার৷ অনেক সময় পর্যাপ্ত ইনসুলিন নেওয়া সত্ত্বেও সুগার ঠিক ভাবে কমে না, অর্থাৎ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হয়৷ তখন ভাল করে ব্যায়াম করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ম্যাজিকের মতো কাজ হয়৷
ইনসুলিন নিলেও নিয়মে শিথিল হবেন না:
ইনসুলিন শুরু করলে আর বন্ধ করা যায় না, এমন নয় সব সময়৷ ডায়াবেটিক রোগী হঠাৎ বড় অসুখে পড়লে বা গর্ভাবস্থায় যত দিন না সমস্যা মিটছে তত দিন ইনসুলিন লাগে৷ তার পর সচরাচর লাগে না৷ বাকি ক্ষেত্রে সত্যিই এটা সারা জীবনের বিষয়৷ তবে তা রোগীর ভাল থাকার স্বার্থেই৷
কিছু তথ্য:
বাড়িতে ফ্রিজ না থাকলেও ক্ষতি নেই৷ গরমকালে মাটির পাত্রে জল নিয়ে তার মধ্যে ইনসুলিনের বাক্স রাখুন৷ শীতে তাও লাগবে না৷ ঘরের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রির কম হলে ২৫–৩০ দিন এমনিই তা ভাল থাকবে৷ ইনসুলিন ডিপ ফ্রিজে রাখা উচিত নয়৷ টাইপ ১ ও জেস্টেশনাল ডায়াবিটিসে (গর্ভাবস্থায় যে ধরনের ডায়াবিটিস হয়) সুগার ওঠা–নামা করতে পারে বলে ঘরে গ্লুকোমিটার রাখা দরকার৷ টাইপ ২–র ক্ষেত্রে সব সময় তা লাগে না৷ ইনসুলিন দেওয়ার সূচ চোখে প্রায় দেখাই যায় না৷ পেটে বা থাইতে ইনজেকশন দেওয়ার সময়ও কিছু বোঝা যায় না৷ অতএব ভয়ের কিছু নেই৷ নিয়ম মেনে ইনসুলিন নিলে আচমকা সুগার খুব কমে যায় না৷ কমলেও তা খুবই ক্ষণস্থায়ী৷ ৩–৪ চামচ গ্লুকোজ বা ২–৩টে লজেন্স খেলেই ঠিক হয়ে যায়৷ তবে চকোলেট জাতীয় কিছু এ সময় না খাওয়াই ভাল৷ কারণ চকোলেটে প্রচুর ফ্যাট থাকে বলে গ্লুকোজ রক্তে মিশতে একটু বেশি সময় নেয়, যা এই সময় হওয়া উচিত নয়৷
ঘরের তাপমাত্রায় দিব্যি ভাল রাখা যায় ইনসুলিন:
ডায়াবিটিসের রোগীদের জন্য অতি প্রয়োজনীয় ইনসুলিন কী ভাবে সংরক্ষণ করা উচিত, তা নিয়ে বেশ কিছু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে অনেকেরই। ঘূর্ণিঝড় আমপানের দাপটে এ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ায় সেই ভ্রান্ত ধারণাই তৈরি করেছে এক অদ্ভুত সঙ্কট। বলতে দ্বিধা নেই, সংবাদমাধ্যমের একাংশও তার জন্য খানিকটা দায়ী।
রোগীদের অনেকেরই ধারণা, ইনসুলিন ফ্রিজের কৃত্রিম ঠান্ডা ছাড়া সংরক্ষণ করা যায় না। ঘরের তাপমাত্রায় রাখা হলে তার কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। তাই ঝড়ের পরে ইনসুলিন ফ্রিজে রাখতে না-পেরে অনেকেই তা ব্যবহার করেননি। যার ফলে খুব দ্রুত তাঁদের রক্তে বেড়ে গিয়েছে শর্করার পরিমাণ। অনেকে আবার চালু থাকা ফ্রিজের খোঁজে ছুটে গিয়েছেন পরিচিত কারও বাড়িতে বা এলাকার কোনও দোকানে। সংবাদমাধ্যমে সেই খবর ফলাও করে প্রচারিত হয়েছে।
অথচ, ডাক্তারবাবুদের একটু জিজ্ঞাসা করে নিলেই এই অবাঞ্ছিত সঙ্কট তৈরি হত না। কারণ, ইনসুলিন ঘরের তাপমাত্রায় চার-ছয় সপ্তাহ অনায়াসে রাখা যায়। ইনসুলিনের কার্টরিজ বা ভায়ালের গায়ে ৪-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সংরক্ষণের যে নির্দেশিকা থাকে, তা মূলত স্টকিস্টদের জন্য। কারণ, ওষুধের গুদামে বেশ কয়েক মাস পর্যন্ত ইনসুলিন রাখা থাকে। তাই সেখানে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা প্রয়োজন। সুতরাং ওই সময়ে ফ্রিজের বাইরে থাকা ইনসুলিন এখনও ভাল আছে বলেই ধরা যায়।
ফ্রিজ না-থাকলে এবং গ্রীষ্মকালে ঘরের তাপমাত্রা খুব বেড়ে গেলে না-খোলা ইনসুলিন জল ভরা বাটি বা মাটির পাত্রে রাখা যায়। ভেজা ন্যাকড়ায় জড়িয়ে রাখাটাও একটা উপায়। জল ভরা পাত্রে ইনসুলিনের ভায়াল বা কার্টরিজ রাখার সময়ে মনে রাখা দরকার, জল আর ইনসুলিন যেন পরস্পরের সংস্পর্শে না আসে। সরাসরি সূর্যের আলোতেও ইনসুলিন রাখা উচিত নয়। তবে যাঁরা একসঙ্গে অনেক মাসের ইনসুলিন কিনে রাখেন, তাঁদের কিন্তু ফ্রিজেই রাখতে হবে। আবার ফ্রিজ থেকে বার করেই যেন সেই ঠান্ডা ইনসুলিন শরীরে প্রবেশ করানো না-হয়। ইনসুলিন পেন কিন্তু ফ্রিজে রাখলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
ইনসুলিন যেখানে রাখা হচ্ছে, সেখানকার তাপমাত্রা কোনও অবস্থাতেই ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নীচে এবং ৪০ ডিগ্রির উপরে থাকাটা কাম্য নয়। ঘরের তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রির নীচে থাকলে সব চেয়ে ভাল। ডিপ ফ্রিজে ইনসুলিন রাখতে পইপই করে বারণ করে দিই আমরা। অত ঠান্ডায় ইনসুলিন কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। দোকানে গিয়ে ইনসুলিন কেনার সময়েও মাথায় রাখা দরকার তাপমাত্রার বিষয়টি। দোকানি ফ্রিজ থেকে ইনসুলিন বার করে দিলে যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব তা বাড়িতে নিয়ে আসা উচিত। যাতে বাইরের গরম ইনসুলিনের কার্যকারিতায় প্রভাব না ফেলে।
বেড়াতে যাওয়ার সময়ে ইনসুলিন সঙ্গে নিতে হলে কিছু ক্ষণ ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করে সেটি থার্মোফ্লাস্কে নেওয়া উচিত। বিমানে ইনসুলিন কিন্তু কেবিন ব্যাগেজে নেওয়াই ভাল। আরও দুটো কথা জানিয়ে রাখি। ইনসুলিন পেনের সঙ্গে সুচ লাগিয়ে রাখা ঠিক নয়। আর মেয়াদ-উত্তীর্ণ ইনসুলিন ব্যবহার না-করাই উচিত
তথ্যসূত্র:
- আনন্দবাজার।
- Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই