মানষিক চাপের কারণে যেসব রোগ শরীরে বাসা বাঁধে
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব বিভাগে কাজ করছেন মোজাফ্ফর সাহেব। ইদানীং তিনি বুকের ভেতর অস্বস্তিবোধ করেন। রাতে ঠিকমতো ঘুম আসে না। সাধারণ বিষয়গুলো কিছুতেই মনে রাখতে পারছেন না। অল্পতেই রেগে যাচ্ছেন। হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং নিউরোলজিস্ট প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানালেন তাঁর হৃদ্যন্ত্রে কোনো সমস্যা নেই, বুকে-পেটেও সমস্যা নেই, সমস্যা নেই মস্তিষ্কেও। চিকিৎসকেরা তাঁকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠালেন! নিতান্ত অনিচ্ছায় মোজাফ্ফর সাহেব মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গেলেন। সেখানে বিশদ সাক্ষাৎকারে জানা গেল অফিসের একটি বড় অঙ্কের হিসাবে গোলমাল হওয়ায় মোজাফ্ফর সাহেব তীব্র মানসিক চাপে আছেন। মানসিক চাপ থেকে তাঁর নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সঠিক চিকিৎসায় তিনি সুস্থবোধ করতে লাগলেন।
অনেক সময় জীবনে চলে আসে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। হুট করে ঘটে যায় এমন ঘটনা, যা আমাদের কল্পনারও বাইরে। ঠিক সেই সময় পরিবর্তিত প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে মনোজগতে তৈরি হয় আলোড়ন। তৈরি হয় মানসিক চাপ, যাকে বলা হয় ‘স্ট্রেস’। এই মানসিক চাপের কারণে কেবল মনোজগতের পরিবর্তনই ঘটে না বরং উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু শারীরিক লক্ষণও দেখা দেয়। মানসিক চাপের কারণে মস্তিষ্কে কিছু রাসায়নিক বস্তু বা নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্য নষ্ট হয়, অন্তঃক্ষরা বিভিন্ন গ্রন্থি থেকে নিঃসরিত হরমোনের ঘাটতি-বাড়তি হয় এবং এসবের প্রভাবে হৃদ্যন্ত্রের সংকোচন-প্রসারণের হার পরিবর্তিত হয়, নিশ্বাস-প্রশ্বাস হয় অস্বাভাবিক। তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে যে শারীরিক কোনো সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু মানসিক চাপের কারণেও যে এমনটা হতে পারে সেটাও মনে রাখা প্রয়োজন।
মানসিক চাপের কারণে ভুলে যাওয়া, সহজেই রেগে যাওয়া, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো, দুশ্চিন্তা, বিচার-বুদ্ধি লোপ পাওয়া, মনোযোগ কমে যাওয়া, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া, মন খারাপ, উৎসাহ-উদ্দীপনা কমে যাওয়া ইত্যাদি মনোসামাজিক লক্ষণ দেখা দেয়। পাশাপাশি যেসব শারীরিক অসুস্থতা বা যেসব লক্ষণ সাধারণত দেখা দিতে পারে, সেগুলো হলো—
* মাথা ব্যথা করা, মাথা ভারী অনুভব করা বা মাথা ঘোরানো
* মাংসপেশিতে ব্যথা বা খিঁচ ধরা
* বুকে ব্যথা বা অস্বস্তিবোধ হওয়া, বুক ধড়ফড় হওয়া
* শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া বা দ্রুত বারবার শ্বাস নেওয়া
* দুর্বল লাগা, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসা
* যৌনাকাঙ্ক্ষা ও যৌনশক্তি কমে যাওয়া
* পেট ফাঁপা, পেট সব সময় ভরা বোধ করা, বুক-পেট জ্বলা
* হজমের সমস্যা হওয়া, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য বা বমি বমি ভাব
* বারবার বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হওয়া
* খিদে কমে যাওয়া বা কখনো খিদে বেড়ে যাওয়া
* ঘুম কমে যাওয়া, ঘুম না আসা
* হাত-পা ঘামা ও মৃদু কাঁপুনি
* মুখ শুকিয়ে যাওয়া
* রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া
* প্রায়ই ছোটখাটো সংক্রমণ ও ঠান্ডাজনিত রোগে ভোগা
* চোয়াল শক্ত হয়ে আসা ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাঁতে দাঁতে বাড়ি লাগা
* ডায়াবেটিসের রোগীদের রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়া
* হাঁপানি, হৃদ্রোগ বা দীর্ঘমেয়াদি চর্মরোগ যাঁদের রয়েছে, তাঁদের মধ্যে এগুলোর উপসর্গ হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়া
* নারীদের ক্ষেত্রে অনিয়মিত ঋতুস্রাব হওয়া।
সবার ক্ষেত্রে সব সময় একই রকম লক্ষণ প্রকাশ পায় না। মানসিক চাপের কারণ এবং পরিস্থিতি আয়ত্ত করার ব্যক্তিগত দক্ষতা বা ‘কোপিং মেকানিজম’-এর ওপর লক্ষণ নির্ভর করে। একই ঘটনায় বিভিন্ন ব্যক্তির শারীরিক-মানসিক লক্ষণ বিভিন্ন হতে পারে। শারীরিক এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে শারীরিক চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি মানসিক চাপের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। ঘরে-বাইরে কোনো পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যে কেউ মানসিক চাপে পড়তে পারেন।
তথ্যসূত্র:
- প্রথম আলো।
- Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই