পটাসিয়াম আছে যেসব খাবারে
যে কোনও সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের দিনে এক চা চামচের কম নুন খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। কারণ নুনের মূল উপাদান সোডিয়ামের উর্ধ্বসীমা দিনে ২ গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারলে উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের অসুখ, স্ট্রোকের চান্স অনেক কমে যায়৷ আবার এই সব অসুখের হাত থেকে মুক্তি পেতে দিনে কম করে ৩৫১০ মিলিগ্রা পটাশিয়াম খাওয়া দরকার৷ কিন্তু সমস্যা হল, সোডিয়াম যে কেবল নুনেই আছে এমন তো নয়, প্রায় সব পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবারেই সে আছে বেশ ভাল মাত্রায়৷ যেমন ধরা যাক, দুধ বা আলু৷ অন্য সাধারণ খাবারের সঙ্গে ৪–৫টি মাঝারি মাপের আলু বা ৫–৬ গ্লাস দুধ খেলে পটাশিয়ামের এই বিপুল চাহিদা পূরণ হওয়া সম্ভব৷
আবার সোডিয়াম কম খেতে চাইলে এত আলু বা দুধ খাওয়া একেবারে চলবে না৷ নুন বাদ দিয়ে অন্যান্য প্রায় সব খাবারের ক্ষেত্রেই এই একই কথা সত্যি৷ ফলে একটি উপাদানকে কমিয়ে আর একটিকে এতখানি বাড়ানো কতটা সম্ভব তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে৷ ‘ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল’-এ প্রকাশিত ‘ডায়াটারি ন্যাশনাল সার্ভে’-তে দেখা যাচ্ছে আমেরিকাতে ১ হাজার জন মানুষের মধ্যে ৩ জন এই লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছোতে পারছেন৷ ফ্রান্সে পারছেন হাজারে ৫ জন, মেক্সিকোতে দু’হাজারে তিন জন ও ইংল্যান্ডে হাজারে এক জন৷ অর্থাৎ এক ঢিলে দু’পাখি মারতে পারছেন না অধিকাংশ মানুষই৷
| নোনতা খাবার খাওয়া কমিয়ে কম ক্যালোরির সুষম খাবার খেতে শুরু করুন৷ |
পটাশিয়ামের খাতিরে সোডিয়াম বা লবণ:
সুষম খাবার খেলে শরীরে পটাশিয়ামের ঘাটতি হয় না বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা৷ কিন্তু তা করতে গিয়ে এক–আধটু বেশি সোডিয়াম শরীরে এসে যেতে পারে৷ তাতে তত ক্ষতি নেই৷ কারণ তাকে ঝড়িয়ে ফেলতে দিনে ৪০–৪৫ মিনিট ঘাম ঝড়ানো ব্যায়াম করাই যথেষ্ট৷ আমাদের মতো গরমের দেশে এমনিও ঘামের কমতি নেই৷ ফলে কখনও আবার পরিস্থিতি এমন হয় যে আলাদা করে নুন খাওয়ার প্রয়োজন হয়৷ বিশেষ করে যাঁরা নানা রকম ওষুধপত্র খেয়ে হাইপ্রেশারকে বশে রাখেন, তাঁরা যদি প্রচুর ঘেমেনেয়ে যান, প্রেশার অনেক কমে যেতে পারে৷ তখন অতিরিক্ত নুন খেয়ে তাকে স্বাভাবিক পর্যায়ে না নিয়ে এলে যথেষ্ট বিপদ৷ ডায়েরিয়া হলেও এক ব্যাপার৷ অতিরিক্ত নুন তখন প্রাণ বাঁচাতে কাজে আসে৷ কাজেই নুনের ক্ষেত্রে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত৷ কিন্তু সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের ক্ষেত্রে পটাশিয়ামের জন্য কোনও দু’রকম নিয়ম নেই৷ কারণ সার্বিক সুস্থতার জন্য, বেশ কিছু অসুখবিসুখকে বশে রাখতে শরীরে এর পরিমাণ ঠিক রাখা একান্ত দরকার৷
| দুই গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখুন নুনের পরিমাণ। |
শরীরে ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য রক্ষার জন্য যেসব খনিজ প্রয়োজন তার মধ্যে বেশ গুরুত্বপূর্ণ পটাশিয়াম। এটি মাংসপেশি এবং স্নায়ুর কার্যক্ষমতা সচল রাখতে সাহায্য করে। রক্তচাপ বশে রাখতে ওষুধ খাওয়া ও অন্যান্য নিয়ম মানার পাশাপাশি পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খেলে ভাল কাজ হয়৷ রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমাতে সরাসরি পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবারের কোনও ভূমিকা না পাওয়া গেলেও দেখা গিয়েছে, যে সব খাবার খেলে কোলেস্টেরল কমে তাতে পটাশিয়াম বেশি থাকে৷ অর্থাৎ এই জাতীয় খাবার খেলে কোলেস্টেরলকে বশে রাখা সহজ হয়৷ হার্টও ভাল থাকে৷ অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের সমস্যা বা অ্যারিদমিয়া নামের রোগ থাকলে চিকিৎসার পাশাপাশি পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খান৷ হৃদপেশির কার্যকারিতা বেড়ে চটপট রোগের উন্নতি হবে৷ হাড় ও পেশির স্বাস্থের জন্যও পর্যাপ্ত পটাশিয়াম খাওয়া দরকার৷ কারণ দেখা গিয়েছে প্রক্রিয়াজাত খাবার, মাংস ইত্যাদি বেশি খেলে মেটাবলিক অ্যাসিডোসিস নামে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যার পরিণতিতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি নাইট্রোজেন তৈরি হয় শরীরে৷ মাংসপেশির ক্ষয়–ক্ষতির মূলেও এর হাত থাকে৷ পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খেলে এই ব্যাপারটা অনেকটাই ঠেকানো যায়৷
পটাশিয়ামের উৎস:
সোডিয়াম-পটাশিয়ামের পর্যাপ্ত উৎস ডাবের জল। এ ছাড়াও কিছুটা মেলে পালং শাক, আলু, মিষ্টি আলু, টমেটো, মাশরুম, স্কোয়াশ, বিট, মুলো, সোয়াবিন, ক্যান্ড সাদা বিন, মুগ ডাল, দুধ, দই, নাসপাতি, কলা, আম, জাম, কমলা, পেঁপে, অ্যাভোক্যাডো, পেস্তা, কিসমিস, অ্যাপ্রিকট, প্রন, মাছ, চিকেন, রেড মিট ইত্যাদিতে৷ অন্য শাকসব্জি–ফলেও আছে যথেষ্ট৷ কাজেই সুষম খাবার খাওয়ার অভ্যাস থাকলে শরীরে এর অভাব হবে না।
এক্ষেত্রে পটাশিয়ামের খুব ভালো উৎস হলো:
দেহে ঝটপট শক্তি সরবরাহে পটাশিয়াম সমৃদ্ধ কলার রয়েছে বিপুল ব্যবহার। স্ট্রোক ও হৃদরোগ প্রতিরোধে প্রধান খাদ্য উপাদান হতে পারে পটাশিয়াম। মাঝারি একটি কলাতে ৪২২ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পটাশিয়াম থাকতে পারে। কলা ছাড়াও এমন কিছু খাবার আছে যেগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের পটাশিয়ামের চাহিদা মেটাতে সক্ষম এবং সহজেই কলার বিকল্প হিসেবে খাওয়া যেতে পারে-
১. সাদা ও মিষ্টি আলু-
আলুর পুষ্টিগুণ অনেক। কেবল মিষ্টি আলুতে নয়, সাদা আলুতেও পটাশিয়াম রয়েছে। একটি মিষ্টি আলুতে ৪৩৮ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পটাশিয়াম থাকতে পারে। অন্যদিকে, সাদা আলুর ক্ষেত্রে এ পরিমাণ হতে পারে দ্বিগুণ, প্রতিটি আলুতে ৯৫০ মিলিগ্রাম। দুই ধরনের আলুতেই উচ্চমাত্রায় ভিটামিন-এ বিদ্যমান।
২. ডালিম-
ডালিম অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর ফল ও পটাশিয়ামের একটি দুর্দান্ত উত্স। একটি ডালিমে ৬৬৬ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পটাশিয়াম থাকতে পারে। এ ছাড়া ডালিম ভিটামিন সি, কে ও ফোলেটে পরিপূর্ণ। আর এ ফলটিতে বেশিরভাগ ফলের তুলনায় প্রোটিনের পরিমাণও বেশি থাকে প্রায় ৪ দশমিক ৭ গ্রাম পর্যন্ত।
৩. টমেটো সস-
টমেটো সস যে পটাশিয়ামের ভালো উৎস হতে পারে তা শুনে হয়তো অনেকেই অবাক হবেন। তবে পিজা, পাস্তা ও বার্গারসহ ফাস্টফুডে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত এ সসের এক কাপে থাকতে পারে ৯০৫ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পটাশিয়াম।
টমেটো বা রান্না করা টমেটো খেলে তা আপনার শরীরের পটাশিয়ামের ঘাটতি মেটাতে সহায়তা করতে পারে। এমনিতেই খাবারের স্বাদ বাড়াতে অনন্য এই সস। তিন টেবিল চামচ বা ৫০ গ্রাম পরিমাণ টমেটো সসে ৪৮৬ মিলিগ্রাম পটাশিয়ামের সরবরাহ থাকে।
৪. মটরশুটি-
আশ্চর্যজনক ভাবে, মটর শুঁটি থেকে আপনি পেতে পারেন সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পটাশিয়াম। এক কাপ মটর শুঁটিতে থাকতে পারে ১ হাজার ১৯০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পটাশিয়াম, যা প্রতিদিনকার প্রয়োজনের চার ভাগের এক ভাগ। এছাড়া উপরি পাওনা হিসেবে প্রোটিন, আঁশ ও ভিটামিন তো রয়েছেই।
৫. তরমুজ-
মাত্র দু’ফালি তরমুজে থাকতে পারে ৬৪০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পটাশিয়াম। পাশাপাশি তরমুজের প্রধান খাদ্য উপাদান হচ্ছে লাইকোপেন, যেটি এক ধরনের উদ্ভিদ পিগমেন্ট। ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস করতে লাইকোপেনের ভূমিকা বহুলভাবে স্বীকৃত।
৬. দই-
ক্যালসিয়ামের একটি অন্যতম প্রধান উৎস হলো দই, পাশাপাশি প্রতি কাপ দই এ ৩৮০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম থাকে। সঙ্গে এক টেবিল চামচ হ্যাজেলনাট আইসক্রিম মিশিয়ে নিলেই হলো। পেয়ে যাবেন বাড়তি ২১১ মিলিগ্রাম পটাসিয়াম, যা সমপরিমাণ কলায় উপস্থিত পটাশিয়ামের থেকেও বেশি।
৭. পালংশাক-
পুষ্টিতে ভরপুর পালংশাক। তাই একে নিয়মিত খাদ্য তালিকায় রাখা উচিত। পালংশাকে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম পাওয়া যায়। ১০০ গ্রাম পরিমাণ পালংশাকে ৫৫৮ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম থাকে। আর এর এক কাপে প্রায় ৫৪০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পটাশিয়াম থাকতে পারে।
৮. বীটরুট-
বিটরুটে কলার চেয়েও বেশি পরিমাণে পটাশিয়াম থাকে। বীটরুট আজকাল অনেকে খেয়ে থাকেন। সালাদ হিসেবে খেতে অনেকেই ভালোবাসেন। নানাবিধ উপকারি উপাদানে পরিপূর্ণ সবজি এটি। রান্না বা সেদ্ধ বিটরুট পটাশিয়ামের শক্তিশালী উৎস। এজন্য সম্ভবত ক্রীড়াবিদরা বীটরুট খেয়ে থাকেন। এককাপ পরিমাণ বীটরুটে ৫১৮ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম থাকে। বাড়তি হিসেবে পাচ্ছেন ফলেট, ম্যাঙ্গানিজ, কপার, আঁশ, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন-সি, আয়রন এবং ভিটামিন বি-৬। এ কারণে এটি উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ করার পাশাপাশি রক্তনালিগুলোর কার্যকারিতা উন্নত করে ও হৃদরোগে উপকারী হিসেবে কাজ করে।
৯. কালো শিমের বিচি-
কালো শিমের বিচি উচ্চমাত্রার ভক্ষণযোগ্য ফাইবার, প্রোটিন এবং আরো নানা ধরনের পুষ্টির আধার। কালো সিমের মধ্যে শুধু ফাইবার বা প্রোটিন নয়, অনেক পটাশিয়ামও রয়েছে এই খাবারে।
১০. অ্যাডামাম-
এগুলো এক ধরনের সয়াবিন যা ঐতিহ্যগতভাবে জাপানে খাওয়া হয়। এগুল্র ভিটামিন কে, ম্যাগনেসিয়াম এবং ম্যাঙ্গানিজের একটি ভালো উৎস। এক কাপ অ্যাডামামে ৬৭৬ মিলিগ্রামের বেশি পটাশিয়াম থাকে।
১১. ইয়োগার্ট-
ইয়োগার্ট একপ্রকার দই জাতীয় খাবার যা পটাশিয়ামে ভরপুর। এক কাপ ইয়োগার্টের মধ্যে ৫৭৫ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম থাকে।
শরীর সুস্থ রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পটাশিয়ামের উৎস হিসেবে এখন থেকে কলার পাশাপাশি এসব খাবারও বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
১২. ডাবের পানি-
অনেকেই মনে করেন যে ডাবের পানি শুধু শরীরকে হাইড্রেট করতে উপকারী। কিন্তু এটি যে শরীরের পটাশিয়ামের ঘাটতিও মেটাতে সহায়তা করে তা অনেকেই জানেন না। এক কাপ বা ২৪০ মিলিলিটারে প্রায় ৬০০ মিলি পর্যন্ত পটাশিয়াম মেলে এতে।
তথ্যসূত্র:
- সময় টিভি।
- আনন্দবাজার।
- healthline.com> jugantor.
- ইন্ডিয়া টাইমস> কালের কণ্ঠ।
- Edited: Natural Healing.
কোন মন্তব্য নেই